স্যাটেলাইট কি এবং প্রকারভেদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা | Satellite in Bangla

4
1755
স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইট কি এবং প্রকারভেদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা | Satellite in Bangla

আজকে আপনাদের স্যাটেলাইট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য শেয়ার করবো । স্যাটেলাইট একটি কৃত্রিম উপগ্রহ সেটা আমরা প্রায় সকলেই জানি । স্যাটেলাইট নিয়ে আমাদের আরো কিছু ধারণা বাড়ানোর জন্যই আমাদের আজকের আয়োজন । চলুন শুরু করি তাহলে,

স্যাটেলাইট নিয়ে যা জানবো আজ সেগুলো হলোঃ

০১। স্যাটেলাইট কি?

০২। স্যাটেলাইট কতো প্রকার ও কি কি ?

০৩। কাজের উপরে ভিত্তি করে স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ ।

০৪। স্যাটেলাইটের প্রয়োজনীয়তা ।

স্যাটেলাইট কি?

আমরা সকলেই জানি যে গ্রহগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে তাকে উপগ্রহ বলা হয় । আর উপগ্রহ আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে একটা হলো কৃত্রিম আরেকটা হলো প্রাকৃতিক । তেমনি স্যাটেলাইট হচ্ছে একটা উপগ্রহ যেই উপগ্রহ মানুষের দ্বারা সৃষ্টি । তাই সহজেই বোঝা যাচ্ছে স্যাটেলাইট একটা কৃত্রিম উপগ্রহ ।

স্যাটেলাইট

মানুষের সৃষ্টি এই স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ পুরো পৃথিবীকে চব্বিশ(২৪) ঘন্টা পরে পরে অতিক্রম করে থাকে । স্যাটেলাইট নানাভাবে আমাদের সাহায্য করে থাকে যেমন, টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারন, ইন্টারনেট, দূরবর্তী টেলিযোগাযোগ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ইত্যাদির প্রয়জনে আমরা স্যাটেলাইট ব্যাবহার করে চলেছি ।

স্যাটেলাইট কতো প্রকার ও কি কি ?

মূলত স্যাটেলাইট তিন(০৩) প্রকার,

ক। লো-আর্থ অরবিট (LEO-Low Earth Orbit)

খ। মিডিয়াম আর্থ অরবিট (MEO- Medium Earth Orbit)

গ। জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিট (GEO-Geostationary Earth Orbit)

লো-আর্থ অরবিট (LEO-Low Earth Orbit)

লো-আর্থ অরবিট এর স্যাটেলাইট পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে ১৬০-২,০০০ কি.মি. উপড়ে অবস্থান করে । যে স্যাটেলাইটগুলো দ্বারা পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করা হয় সাধারণত সেই স্যাটেলাইটগুলোকেই এই কক্ষপথে রাখা হয় । যেহেতু এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী পৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে তাই এই স্যাটেলাইটগুলো দ্বারা প্রায় নিখুঁত ভাবে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করা যায় । এই কক্ষপথেই আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের অবস্থান ।

মিডিয়াম আর্থ অরবিট (MEO- Medium Earth Orbit)

মিডিয়াম আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে ২০,০০০ কি.মি. উপড়ে অবস্থান করে । এই কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলো পাঠাতে অনেক শক্তির দরকার পরে । মিডিয়াম আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইটগুলোর গতিবেগ খুবই মন্থর হয়ে থাকে । মোট ১২টি মিডিয়াম আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট দিয়ে পুর পৃথিবীতে সংযোগ করা যায়, এর সংখ্যা জিওস্টেশনারি আর্থ এর থেকে বেশি কিন্তু লো-আর্থ এর তুলনায় বেশ কম হয় । এই কক্ষপথে সাধারণত জিপিএস স্যাটেলাইটগুলো থাকে ।

জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিট (GEO-Geostationary Earth Orbit)

জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে ৩৬,০০০ কি.মি. উপড়ে অবস্থান করে । এই স্যাটেলাইটের ক্ষমতা অনেক বেশি হয় । টিভি এবং রেডিও ট্রান্সমিশনে এর কাজে জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিট ব্যাবহার করা হয় । সাধারণত অ্যান্টেনার একটা নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে এই কক্ষপথে ।

স্যাটেলাইট

কাজের উপরে ভিত্তি করে স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ

কাজের উপরে ভিত্তি করে স্যাটেলাইটকে বেশ কয়েকভাবে ভাগ করা যায় যেমন, কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট, ওয়েদার স্যাটেলাইট, ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট, প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইট, রেট্রোগ্রাড স্যাটেলাইট, হম্যান স্যাটেলাইট, পোলার স্যাটেলাইট, সান সিঙ্ক্রোনাস অরবিট স্যাটেলাইট ইত্যাদি । চলুন এগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারনা নেই এবার,

কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট (Communication Orbit)

নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তথ্যের আদান প্রদান করার জন্য এই স্যাটেলাইট ব্যাবহার করা হয় । কম্যুনিকেশনের এই সিস্টেমকে স্পেস কম্যুনিকেশনও বলা হয়ে থাকে । এর মাঝে ব্রডকাস্টিং স্যাটেলাইট অন্তর্ভূক্ত । পাওয়ার সাপ্লাই, ট্রান্সমিটার বা প্রেরক যন্ত্র, রিসিভার বা গ্রাহক যন্ত্র এবং অ্যান্টেনা নিয়ে এই স্যাটেলাইট গঠিত ।

কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট সিস্টেমে আর্থ স্টেশনের ট্রান্সমিটার হতে মডুলেটেড সিগন্যাল বা মাইক্রোওয়েভ স্যাটেলাইটে পাঠানো হয়। তারপরে স্যাটেলাইট ঐ মডুলেটেড সিগন্যালকে বিবর্ধিত করে পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায় । এই ভাবে সিগন্যাল গ্রহন এবং সেটা বর্ধিত করে আবার গ্রাহক স্টেশনে পাঠাবার মাধ্যমে কম্যুনিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ।

ওয়েদার স্যাটেলাইট  (Weather Orbit)

ওয়েদার স্যাটেলাইটের দ্বারা পৃথিবীর আবহাওয়া সংক্রান্ত ফটো ধারন করা হয়ে থাকে । কিছু ওয়েদার স্যাটেলাইট হলো GEOS , COSMOS এবং TIROS স্যাটেলাইট । আবহাওয়া পর্যবেক্ষনের সকল কাজ ওয়েদার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে ।

ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট (Navigation Orbit)

এই স্যাটেলাইট মূলত পথ নির্দেশনা করার কাজে ব্যাবহার করা হয় যেমন, সমুদ্রগামী জাহাজ ডিটেক্ট এবং বিমান ইত্যাদি এর পথ নির্দেশনা দিতে ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যাবহার করা হয়ে থাকে । GPSNAVSTAR এমনই একটি স্যাটেলাইট । আবার জিপিএস এমন একটি স্যাটেলাইট নেভিগেশন মাধ্যম, এখানে সময়ে এবং যেকোন আবহাওয়াতেই নিরবিচ্ছিন্নভাবে যেকোনো তথ্য এবং পৃথিবীর যে কোন অবস্থানের ছবি পাঠানো যায় ।   ২৪টা স্যাটেলাইট দ্বারা এই সিস্টেম তৈরি করা হয় ।

প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইট (Prograde Orbit)

প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইটের অরবিটের সাথে পৃথিবীর কোন এক সমকোন এর থেকে কম হয়ে থাকে । সাধারনত পৃথিবীর ঘূর্ণন যে দিকে হয় প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইটও ঐ একই দিকে ঘোরে ।

স্যাটেলাইট

রেট্রোগ্রাড স্যাটেলাইট (Retrograde Orbit)

রেট্রোগ্রাড স্যাটেলাইট প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইটের ঠিক উল্টো কাজ করে । এই অরবিটের সাথে পৃথিবীর কোন এক সমকোন এর থেকে বেশি হয়ে থাকে । আবার এই স্যাটেলাইট পৃথিবী যে দিকে ঘোড়ে তার বিপরীত দিকে ঘোরে ।

হম্যান স্যাটেলাইট (Hohmann Transfer Orbit)

এই স্যাটেলাইট জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইটের সাহায্যে ব্যাবহার করা হয় নির্দিষ্ট গন্তব্যে এর অরবিটে সিগন্যাল পেরন করার কাজে । এটি লো-আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইটেও হম্যান স্যাটেলাইট ব্যাবহার করা হয় । এই স্যাটেলাইটগুলো সাধারনত উপবৃত্তাকার হয়ে থাকে ।

পোলার স্যাটেলাইট (Polar Orbit)

এই স্যাটেলাইটের অরবিটের সাথে পৃথিবীর কোন একদম এক সমকোন হয়ে থাকে। এটি NPOESS স্যাটেলাইট সমূহ প্রত্যেকবার ঘূর্ণনের সময় দক্ষিন মেরু এবং উত্তর মেরু এই দুই মেরুর উপড়ে দিয়েই চলে ।

সান সিঙ্ক্রোনাস অরবিট স্যাটেলাইট (Sun Synchronous Orbits Sattelite)

এটির নাম সূর্যের সাথে মিলিয়ে রাখা হয়েছে সান সিঙ্ক্রোনাস অরবিট স্যাটেলাইট । এই স্যাটেলাইটগুলো এমন ভাবে পৃথিবীর সাথে ঘোরে যাতে সবসময় সূর্যের আলো এর উপরে পড়ে । তাই বলা চলে এগুলো কখনোই অন্ধকারে থাকে না CRYOSAT-2 একটি সান সিঙ্ক্রোনাস অরবিট স্যাটেলাইট ।

স্যাটেলাইটের প্রয়োজনীয়তা

অনেকসময় আমাদের মাঝে প্রশ্ন আশে আমরা চাইলেইতো টাওয়ার অথবা এন্টেনা বসিয়ে আমাদের দরকারি তথ্য এক স্থান হতে অন্য স্থানে পাঠাতে পারি তাহলে কেওন এতো টাকা নষ্ট করে স্যাটেলাইট পাঠাই ? ব্যাপারটা একটু ভিন্ন ভাবে বলি, ধরুন আপনার হাতে একটা বল আছে সেই বলটা আপনার আরেকটা বন্ধুকে ছুরে দিবেন এবং সেটা সে ধরবে । কিন্তু আপনার বন্ধু যদি কাছে থাকে তাহলেই কেবল আপনার ছোরা বল সে ধরতে পারবে । সে যদি দূরে থাকে তাহলে আপনার ছোরা বল সে ধরতে পারবেনা । সেই ক্ষেত্রে আপনি এবং আপনার বন্ধুর মাঝে যদি আরেকজনকে দ্বার করান তাহলে খুব সজেই আপনার দূরে থাকে বন্ধুর কাছে বলটা পৌছতে পারেন । এমন না হলে আপনার ছোড়া বলটা আপনার বন্ধু পর্যন্ত পৌছতে পারবেনা, অর্থাৎ বলটা নিচে পরে যাবে অথবা হারিয়ে যেতে পারে ।

স্যাটেলাইট

ঠিক তেমনি আপনার বিদেশে অথবা অনেক দূরে থাকা বন্ধু অথবা অন্য কাউকে যদি কোন ছবি বা ফাইল টাওয়ার বা এন্টেনার মাধ্যমে পাঠাতে চাই তাহলে আপনার পাঠানো ডাটাটি লস হয়ে যাবে । কারন হচ্ছে আমাদের এই পৃথিবী কমলালেবুর মত বা প্রায় গোলাকৃতির । আপনার ডাটা যখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাঠাবেন তখন সেটা খুব সহজেই পৌঁছে যাবে নির্দিষ্ট স্থানে । কারন স্যাটেলাইট এই সময় যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে থাকে । তাই স্যাটেলাইট ব্যাবহার করা এতটা জরুরী ।

স্যাটেলাইট নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন এই পর্যন্তই ছিলো । আমরা খুব শিগ্রয় আপনাদের মাঝে স্যাটেলাইট নিয়ে আরো নতুন কিছু লিখা নিয়ে হাজির হবো । স্যাটেলাইট নিয়ে আপনার আলাদাভাবে কোন প্রশ্ন থাকলে আমাদের কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন । আমাদের লিখাগুলো ভালো লাগলে আমাদের জানাবেন আশা করছি । সকলে ভালো থাকুন, EEEcareer এর সাথেই থাকুন ।

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY